পান্ডু বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা লক্ষ্মী দেব মিত্রের কর্মজীবনের সমাপ্তি।
গুয়াহাটি ২৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষকতার অর্থ কেবল শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত শিক্ষকের কাজ সমাজকে পথ দেখানো, একটি প্রজন্মকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা ও একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক রূপান্তর ঘটানো। দীর্ঘ ৩২ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেই মহান দায়িত্ব পালন করে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিক অবসর গ্রহণ করতে চলেছেন পাণ্ডুর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ 'বিদ্যানিকেতন হাইস্কুল'-এর প্রধান শিক্ষিকা লক্ষ্মী দেব মিত্র। তাঁর এই অবসর কেবল একটি সরকারি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়, বরং পাণ্ডু ও বৃহত্তর গুয়াহাটির শিক্ষা মানচিত্রে একটি স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের পূর্ণতা।
শৈশব, পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও উজ্জ্বল শিক্ষাজীবন:
১৯৬৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মালিগাঁওস্থিত উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে হাসপাতালে লক্ষ্মী দেব মিত্র জন্মগ্রহণ করেন। পিতা স্বর্গীয় নলিনী মোহন দেব ও মাতা স্বর্গীয় বাসনা দেবের স্নেহচ্ছায়ায়।
এক আদর্শ ও নীতিবান পরিবেশে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। দাম্পত্য জীবনে তিনি চন্দন মিত্রের সহধর্মিণী। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও অনন্য মেধার অধিকারী। নেতাজি বিদ্যাপীঠ রেলওয়ে হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে তিনি মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়ে তিনি পাণ্ডু কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অগ্রগণ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কটন কলেজ থেকে স্নাতক ও গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কৃতিত্বের সঙ্গে অর্জন করেন। অন্তরে শিক্ষকতার সুপ্ত আকঙ্ক্ষা ও শিক্ষাদান পদ্ধতির গভীর অনুশীলনের তাগিদে তিনি পরবর্তীকালে ওয়েস্ট ওয়াহাটি কলেজ অফ এডুকেশন থেকে বি.এড. ডিগ্রিও সফলভাবে অর্জন করেন।
বিদ্যানিকেতনে পদার্পণ ও প্রধান শিক্ষিকার ভূমিকায় উত্তরণ ১৯৯৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর-নিজের ২৮তম জন্মদিনের শুভলগ্নে-শ্রীমতি লক্ষ্মী দেব মিত্র সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন এবং বিজ্ঞান স্নাতক শিক্ষিকা হিসেবে বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলে পদার্পণ করেন। যোগদানের পর থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলে অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ঠাবান শিক্ষিকা হিসেবে সেবা করার পর, ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি অসীম দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক একাগ্রতার সঙ্গে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে আসছেন।
শিক্ষাগত সংস্কার ও নজরকাড়া ফলাফল তাঁর প্রধান শিক্ষিকার চলাকালীন বিদ্যানিকেতন হাইস্কুল এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের সাক্ষী থাকে। একসময়কার সাধারণ ফল করা এই বিদ্যালয় তাঁর কঠোর অনুশাসন, নিয়মিত মক টেস্ট, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস এবং শিক্ষক-অভিভাবক নিবিড় যোগাযোগের কারণে মেধার শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষায় এইচ এস এল সি গত এক দশক ধরে বিদ্যালয়টি একটানা ৯০ শতাংশ ও তদূর্ধ্ব সাফল্যের হার বজায় রেখে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি অভাবনীয় ১০০% সাফল্য অর্জন করে। প্রতি বছরই এই বিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রথম বিভাগ, ডিস্টিংশন ও স্টার মার্কস অর্জন করে বিদ্যালয় ও গোটা অঞ্চলের মুখ উজ্জ্বল করছে। এই বিপুল পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিল প্রধান শিক্ষিকার উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও সুদৃঢ় শিক্ষানীতি।
পরিকাঠামোগত বিপ্লব ও আরআইডিএফ প্রকল্প:
কেবল পঠনপাঠনই নয়, বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিকাঠামো উন্নয়নে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্কুলের নতুন শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ, একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এবং আধুনিক বিজ্ঞান পরীক্ষাগার স্থাপনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বার্থে তিনি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় স্থাপন করেন। তাঁরই ঐকান্তিক ও নিরলস প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়ে মঞ্জুর হয় বহু প্রতীক্ষিত (রুরাল ইনফরাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ) প্রকল্প, যার আধুনিক নির্মাণকাজ বর্তমানে জোরকদমে এগিয়ে চলেছে।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা:শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর এই অনন্য ও নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতি জানিয়েছে সমাজ ও সরকার উভয়ই। স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর শ্রদ্ধার পাশাপাশি শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকেও তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান। বিগত শিক্ষক দিবস উপলক্ষে (৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) আসাম সরকারের শিক্ষা বিভাগ তথা শিক্ষা পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর অফ স্কুলস , KDC-M) কর্তৃক তাঁকে প্রদান করা হয় জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা-"জিলা কৃতি শিক্ষক বটা"। আসামের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ড. রনোজ পেণ্ড শ্রীমতি লক্ষ্মী দেব মিত্রকে এই পুরস্কারটি প্রদান করেন।
পাণ্ডু অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই অনন্য গৌরব ও সরকারি সম্মাননা অর্জন করে গোটা অঞ্চলের গৌরব বৃদ্ধি করেছেন।
বিদায়ের ক্ষণে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা শিক্ষকের কোনো আনুষ্ঠানিক অবসর হয় না; একজন প্রকৃত শিক্ষক আমৃত্যু সমাজের পথপ্রদর্শক ও আলোকবর্তিকা হিসেবে বেঁচে থাকেন। শ্রীমতি লক্ষ্মী দেব মিত্রের মতো অনন্য প্রশাসনিক দক্ষতা, অগাধ পাণ্ডিত্য ও মাতৃসুলভ হৃদয়ের অধিকারিণী ব্যক্তিত্বের অভাব বিদ্যালয় পরিবার, প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সমাজ গভীরভাবে অনুভব করবে। অবসরোত্তর জীবনে তিনি সুস্থ থাকুন, দীর্ঘায়ু লাভ করুন এবং তাঁর প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে আরও বহুকাল সমাজকে আলোকিত করুন-এই প্রার্থনাই করছেন পাণ্ডুর সর্বস্তরের মানুষ।




No comments