Header Ads

https://drive.google.com/file/d/1KYvwcVfpdZA0pOa_z8Gqbqub5aWa8YEk/view?usp=sharing.jpg

একা এবং কয়েকজন পত্রিকার বাৰ্ষিক সংখ্যা উন্মোচন


 
মনোজগোপাল গোস্বামী

 

গুয়াহাটি, ৭ এপ্রিল:


লিটল ম্যাগাজিন মানেই সংগ্রাম। লিট্ল ম্যাগাজিন মানেই বেঁচে থাকার লড়াই। বহু ঘাত-প্রতিঘাত সয়ে, নানা ব্যথা-যন্ত্রণাকে বুকে নিয়ে কণ্টকাকীর্ণ পথে এগিয়ে যেতে হয় প্রতিটি লিট্ল ম্যাগাজিনকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম নিয়ে সত্তরের দশকে মালিগাঁয়ের কয়েকটি যুবক একদিন তাঁদের স্বপ্নের পত্রিকা 'একা এবং কয়েকজন' শুরু করেছিল। মূলধন এ-অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য প্রেম। নানান প্রতিকূলতার সঙ্গে মোকাবিলা করে সেই পত্রিকা এগিয়ে চলে মাথা উঁচু করে। সেই চলা থামেনি। পূর্ণ হল ৪৬ বছর।

৪৭তম বার্ষিক সংখ্যার উন্মোচন হল সম্প্রতি মাছখোয়া আইটিএ সাংস্কৃতিক প্রকল্পের সেমিনার হলে। বলা বাহুল্য, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় 'একা এবং কয়েকজন' পত্রিকাই সম্ভবত এতো দীর্ঘায়ু লাভ করেছে। ফলে তার আত্মীয়-পরিজনের সংখ্যাও প্রচুর। উপত্যকার বাঙালিমাত্রেই, শুধু বাঙালি কেন অসমিয়া লেখক-কবি-সাহিত্যিকরাও এই পত্রিকার কথা জানেন এবং পত্রিকাকে ভালোবাসেন। আর মাত্র তিনটি বছর সৃষ্টি হবে ইতিহাস। 'একা এবং কয়েকজন' পূর্ণ করবে অর্ধ-শতাব্দী।




সম্পাদক উদয়ন বিশ্বাস নন্দনশিল্পের সাধক, সাংবাদিক-চিত্রী। নামলিপি পূর্ণেন্দু পত্রীর। বৃষ্টিমুখর দিনে এই অনুষ্ঠানে বিকেল চারটেয় সমবেত হল বহু মানুষ। মাছখোয়া আইটিএ পরিসরের ছোটো প্রেক্ষাগৃহটি প্রায় পরিপূর্ণ। কবি, চিত্রী, আলোকচিত্রী, লেখক, গবেষক, গায়ক, ক্রীড়াবিদ, বাচিকশিল্পী- কে নেই দর্শকাসনে।উর্মিলা দাশগুপ্তের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতেই সম্পাদক উদয়ন বিশ্বাস শতবর্ষ উদ্যাপনের সমাপ্তি উপলক্ষে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী দিলীপ শর্মাকে স্মরণ করেন। তার আগে নেপথ্যে বেজে ওঠে দিলীপ-কণ্ঠ 'ও আমার দেশের মাটি..।' প্রেক্ষাগৃহে তখন পূর্ণ নীরবতা। সবার মনে বিহার করছেন দিলীপ শর্মা। উদয়ন বিশ্বাসের বক্তব্যের পরপরই নেপথ্যে আবার বেজে ওঠে গান... পুরণি সেই দিনর কথা...।' দিলীপ শর্মা-সুদক্ষিণা শর্মা জুটির এই প্রিয় গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন দিলীপ-তনয়া ঋজুশ্রী শর্মা মজুমদার।


অনুষ্ঠানের সুর বাঁধা হয়ে যায়। কোন ছন্দে, কোন লয়ে অনুষ্ঠান এগোবে, সেটা বুঝতে আর অসুবিধে হয় না। এরপর মঞ্চে আমন্ত্রিত হন 'কথাফুল'-এর চার কন্যা- দেবলীনা সেনগুপ্ত, সন্দীপা চক্রবর্তী, মীনাক্ষী চক্রবর্তী ও সংহিতা রায়। তাঁরা নিবেদন করেন কবিতার কোলাজ। শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, সঞ্জয় চক্রবর্তী, স্বর্ণালী বিশ্বাস, অমিতাভ দেবচৌধুরী, তপন মহন্ত ও অর্জুন দাসের কবিতাই যে ছিল তাঁদের অনবদ্য নিবেদন। এই নিবেদনে ছিল দেশভাগের বেদনা এবং 'অসমী আই'-এর কোলের উষ্ণ স্নেহের প্রকাশ। তাঁদের উত্তরীয় ও ফুল দিয়ে সম্মান জানান পত্রিকাগোষ্ঠীর বরিষ্ঠ সদস্য দেবজ্যোতি চৌধুরী।

এরপর 'একা এবং কয়েকজন' পত্রিকার যে-বার্ষিক সংখ্যাটি উন্মোচন হবে সেই সংখ্যা সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন পত্রিকাগোষ্ঠীর সভাপতি ও পত্রিকার সহকারী সম্পাদক কুমার অজিত দত্ত। ৪৭ বছরের কঠিন পথ চলার একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস উঠে আসে তাঁর ভাষণে। এ-ক্ষেত্রে অগ্রপথিক অন্যান্য পত্রিকার প্রতিও তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রবাসী, সবুজপত্র, শান্তিনিকেতন, সাহিত্য, শতক্রতু ইত্যাদি পত্রিকার কথাও তিনি সকৃতজ্ঞভাবে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অসমিয়া ও বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য সমকালীন বেশ কয়েকজন কবি, শিল্পী এবং অন্যান্য গুণিজনেরা। তাঁরা মঞ্চে উপস্থিত হন- কবি নীলিমকুমার, কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী, শিল্পী জ্ঞানেন্দ্র বরকাকতী, আলোকচিত্রী অনুতোষ দেব, প্রাবন্ধিক ও গবেষক পরমানন্দ মজুমদার। মঞ্চে উপস্থিত সবাইকে উত্তরীয়, পুষ্পস্তবক ও পত্রিকাগোষ্ঠী প্রকাশিত 'গল্পগুচ্ছ' উপহার দিয়ে একে একে স্বাগত জানান পত্রিকাগোষ্ঠীর সদস্যরা। এরপর সদ্য রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য উপাধিতে ভূষিত রবীন্দ্র-জীবনীকার ও রবীন্দ্র-গবেষক এবং পত্রিকার উপদেষ্টা উষারঞ্জন ভট্টাচার্যকে সংবর্ধনা প্রদান করেন পত্রিকাগোষ্ঠীর তরফ থেকে সাধারণ সম্পাদক তাপস রায় ও সভাপতি কুমার অজিত দত্ত। মঞ্চে সমবেত এই গুনিজনদের হাত দিয়েই উন্মোচিত হয় 'একা এবং কয়েকজন'-এর ৪৭তম বর্ষের বার্ষিক সংখ্যা।

বিশিষ্ট কবি নীলিমকুমারের বক্তব্যের পরই সূচনা হয় কবিতা পাঠের আসরের। শুরু করেন স্বয়ং নীলিম। এরপর একে একে কবিতা পাঠ করেন সঞ্জয় চক্রবর্তী, মুনীন্দ্র মহন্ত, কমলিকা মজুমদার, বিকাশ সরকার, সৌরভ শইকীয়া, বিমলেন্দু ভৌমিক, সুব্রত চৌধুরী ও কুশল দত্ত। অসমিয়া ও বাংলা ভাষার এক অপূর্ব সমন্বয়ে এক বর্ণময় কাব্যসুষমা বিরাজ করে সভাকক্ষে।

অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত হন উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা অসমের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার দাবাড়ু মায়াঙ্ক চক্রবর্তী। এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ মায়াঙ্কের হাতে তুলে দেওয়া হয় উত্তরীয়, স্মারক, শুভেচ্ছাপত্র, ফুল ইত্যাদি। এগুলো তাঁর হাতে তুলে দেন তাপস রায়, রতন দত্ত ও বিনয়ভূষণ পাল। শুভেচ্ছাপত্রটি পাঠ করে শোনান মদনগোপাল গোস্বামী। এরপর মঞ্চে আসেন মায়াঙ্কের পিতা কেশব চক্রবর্তী ও মাতৃদেবী ডা. মনোমিতা চক্রবর্তী। এঁদের উত্তরীয় ও ফুল দিয়ে স্বাগত জানান দেবজ্যোতি চৌধুরী।

অনুষ্ঠানের সর্বশেষ আকর্ষণ ছিল গুয়াহাটির সুখ্যাত সংগীতশিল্পী-জুটি সুশান্ত চৌধুরী এবং রুম্পা করচৌধুরীর সংগীতানুষ্ঠান।

প্রথমে তাঁরা রবীন্দ্রনাথের 'এই কথাটি মনে রেখো' দ্বৈত কণ্ঠে নিবেদন করেন। একক কণ্ঠে সুশান্ত চৌধুরী গেয়ে শোনান 'আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন' নজরুল গীতি। রুম্পা পরপর দুটি নজরুল গীতি শোনান- 'আমার নয়নে নয়ন রাখি' ও 'নাই চিনিলে আমায় তুমি'। এরপর আবার সুশান্ত শোনান দুটি কালজয়ী গান- 'আমার স্বপন কিনতে পারে এমন আমির কই' এবং মান্না দের গাওয়া 'ললিতা গো ওকে আজ চলে যেতে বল না।'

সুশান্তর ঐশ্বরিক কণ্ঠস্বরের অনুরণন মনে-মস্তিষ্কে নিয়ে অনুষ্ঠানের শেষে পৌঁছল উপস্থিত সকলে। সুশান্ত-রুম্পার সঙ্গে গিটারে সংগত করেন নটরাজ ভট্টাচার্য এবং তবলায় স্বনামধন্য দেবাশিস ভট্টাচার্য। সবশেষে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান পত্রিকাগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক তাপস রায়। সমগ্র অনষ্ঠানের কুশল সঞ্চালনার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য ঊর্মিলা দাশগুপ্ত (আলো)।

এমন দৃষ্টিনন্দন অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য 'একা এবং কয়েকজন' পত্রিকাগোষ্ঠীর সকল সদস্যদের অসংখ্য ধন্যবাদ।



No comments

Powered by Blogger.