গুয়াহাটি ২৪ অক্টোবর অসমের প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-পরম্পরাকে সংরক্ষণের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সংরক্ষণ বিভাগের সহ-সংরক্ষক ধনজিৎ তালুকদার ‘অসম গৌরব’ সম্মানে সম্মানিত।
এক পাণ্ডুলিপি গবেষক ও প্রশিক্ষক সাঁচিপাতের পাণ্ডুলিপি থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনকালে কাগজে লেখা বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথি—এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সেগুলির জ্ঞান পৌঁছে দেওয়াই তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল।
প্রাচীন পুঁথিগুলিতে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভাণ্ডার লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এই বই গুলি পড়তে ও বুঝতে পারেন না। বইতে ব্যবহৃত বহু শব্দের একাধিক অর্থ থাকায় সেগুলির প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে বিশেষ অধ্যয়ন ও অনুশীলনের প্রয়োজন। এই বিষয়টি উপলব্ধি করেই গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান ধনজিৎ তালুকদার তরুণ প্রজন্মকে প্রাচীন পুঁথি পাঠ ও অধ্যয়নে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেন।
এই কাজের পাশাপাশি তিনি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জাতীয় পাণ্ডুলিপি অভিযান শুরু হওয়ার সময় তিনি এই কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন সত্ৰ ও গ্রামে গিয়ে মানুষের বাড়িতে সংরক্ষিত প্রাচীন পুঁথিগুলি চিহ্নিত করা ও সেগুলির যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার কাজে অংশ নেন। তাঁর উদ্যোগে পঞ্চাশটিরও বেশি সত্ৰে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের কাজ করা হয়। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বই পরিষ্কার করা, ধুলো অপসারণ, উপযুক্ত পরিবেশে রাখা এবং অন্যান্য সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তবে বিভিন্ন সত্ৰে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, বহু জায়গায় মানুষ প্রাচীন পুঁথি পড়তে জানেন না। ফলে পুঁথিগুলির প্রতি তাঁদের আগ্রহও কম। কিছু কিছু সত্ৰে পুঁথি অধ্যয়নের ঐতিহ্য এখনও বজায় থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই চর্চা সীমিত হয়ে পড়েছে। তাই শুধু পুঁথি সংরক্ষণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলি পড়া, বোঝা এবং তার মধ্যে জ্ঞান উপলব্ধি করার শিক্ষাও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় প্রাচীন পুঁথি পাঠ ও শিক্ষাদানের যাত্রা। তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার এই বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পান তিনি। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন থেকে আমন্ত্রণ আসতে থাকে। ধীরে ধীরে তাঁর এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন মহাবিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের প্রাচীন পুঁথি পড়তে ও বুঝতে শেখানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।
তাঁর মতে, প্রাচীন পুঁথিতে শুধু ঐতিহাসিক তথ্যই নয়, রয়েছে বহু আকর্ষণীয় কাহিনি ও মূল্যবান জ্ঞানসম্পদ। এই পুঁথিগুলির অধ্যয়নের মাধ্যমে অসমের নামঘর, সত্ৰ ও রাজ্যের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
প্রায় পনেরো বছর ধরে পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। তাঁর প্রচেষ্টায় বর্তমানে বহু ছাত্রছাত্রী প্রাচীন পুঁথি পড়া ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই আগ্রহ সৃষ্টি হওয়াকে তিনি নিজের কাজের অন্যতম বড় সাফল্য বলে মনে করেন
সম্প্রতি অসম সরকার তাঁকে ‘অসম গৌরব’ সম্মানে ভূষিত করেছে। এই স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের পথে নতুন অনুপ্রেরণা দিবে বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, সরকারি স্বীকৃতি তাঁকে আরও উৎসাহের সঙ্গে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও অধ্যয়নের কাজে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেবে।
গত বছরও বহু প্রাচীন পুঁথি সংরক্ষণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে সেগুলি যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, প্রাচীন পুঁথি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পেলে অসমীয়া জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-পরম্পরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সুরক্ষিত থাকবে। শুধু বই সংগ্রহ করে রাখলেই হবে না, সেগুলি অধ্যয়ন করতে হবে এবং তার মধ্যে নিহিত জ্ঞান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তাহলেই এই অমূল্য ঐতিহ্যের প্রকৃত সংরক্ষণ কাজে লাগবে।




No comments:
Post a Comment